
ডিস্টাল টিউবাল ব্লক:
ডিস্টাল টিউবাল ব্লক (Distal Tubal Block) হল ফ্যালোপিয়ান টিউবের একটি নির্দিষ্ট প্রান্তে (ডিম্বাশয়ের কাছাকাছি) সৃষ্টি হওয়া বন্ধ বা বাধা। এটি নারী বন্ধ্যাত্বের একটি সাধারণ কারণ। ফ্যালোপিয়ান টিউব ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণুকে জরায়ুর দিকে নিয়ে যায়, এবং যদি এই পথ বন্ধ হয়ে যায়, তবে ডিম্বাণু এবং শুক্রাণুর মিলন বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে গর্ভধারণ সম্ভব হয় না।
ডিস্টাল টিউবাল ব্লকের কারণসমূহ:-
ডিস্টাল টিউবাল ব্লক সাধারণত ফ্যালোপিয়ান টিউবের প্রদাহ বা ক্ষতজনিত কারণে হয়ে থাকে। নিচে এর প্রধান কারণগুলি উল্লেখ করা হলো:
১. পেলভিক ইনফ্লেমেটরি ডিজিজ (PID) বা পেলভিক সংক্রমণ-
* এটি যৌনবাহিত রোগের (যেমন ক্ল্যামিডিয়া বা গনোরিয়া) কারণে হতে পারে।
* সংক্রমণ ফ্যালোপিয়ান টিউবে ছড়িয়ে পড়লে এটি প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা টিস্যুর মধ্যে আঠালো অংশ (scar tissue) তৈরি করতে পারে এবং টিউব বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
২. টিউবারাল (ফ্যালোপিয়ান টিউব) সংক্রমণ বা হাইড্রোসালপিঙ্ক্স-
* হাইড্রোসালপিঙ্ক্স হল এমন এক অবস্থা যেখানে ফ্যালোপিয়ান টিউবে তরল জমে টিউব ফুলে যায় এবং এটি ব্লক হয়ে যায়।
* এটি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের কারণে হয়।
৩. অ্যাবডোমিনাল বা পেলভিক সার্জারি-
* পূর্বের অস্ত্রোপচার (যেমন অ্যাপেনডিসাইটিস, সিজারিয়ান, অথবা ডিম্বাশয়ের অস্ত্রোপচার) করলে ফ্যালোপিয়ান টিউবে আঠালো টিস্যু তৈরি হতে পারে এবং ব্লক সৃষ্টি হতে পারে।
৪. এন্ডোমেট্রিওসিস-
* এন্ডোমেট্রিওসিস হল এক ধরণের রোগ যেখানে জরায়ুর ভেতরের টিস্যু জরায়ুর বাইরের অংশে বৃদ্ধি পায়, যা ফ্যালোপিয়ান টিউবকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং ব্লক সৃষ্টি করতে পারে।
৫. অ্যাক্টিনোমাইকোসিস (Actinomycosis)-
* এটি এক ধরনের ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ, যা টিউব ও ডিম্বাশয়ে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে এবং ব্লক তৈরি করতে পারে।
৬. টিউবারকুলোসিস (TB)-
* যদি কোনো নারী পেলভিক টিউবারকুলোসিসে আক্রান্ত হন, তাহলে এটি ফ্যালোপিয়ান টিউবের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।
**ডিস্টাল টিউবাল ব্লকের লক্ষণ ও উপসর্গ:-
ডিস্টাল টিউবাল ব্লকের সাধারণত সরাসরি কোনো উপসর্গ থাকে না, কিন্তু নিম্নলিখিত কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
* বন্ধ্যাত্ব (Infertility) – এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে গর্ভধারণে ব্যর্থ হওয়া।
* পিরিয়ডের সময় তীব্র ব্যথা (Dysmenorrhea) – যদি এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে হয়।
* পেলভিক অঞ্চলে ব্যথা – দীর্ঘমেয়াদী সংক্রমণের কারণে হতে পারে।
* অনিয়মিত মাসিক চক্র – হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে হতে পারে।
* অতিরিক্ত স্রাব বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব – যদি সংক্রমণ থাকে।
**ডিস্টাল টিউবাল ব্লকের ডায়গনোসিস (পরীক্ষা-নিরীক্ষা)
ডিস্টাল টিউবাল ব্লক নিশ্চিত করতে কিছু বিশেষ পরীক্ষা করা হয়:
১. হিস্টেরোসালপিংগ্রাফি (HSG)
* এটি একটি এক্স-রে পরীক্ষা যেখানে ফ্যালোপিয়ান টিউবের ভেতরে কন্ট্রাস্ট ডাই প্রবেশ করানো হয়। যদি ডাই জরায়ু থেকে ডিম্বাশয়ে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে এটি ব্লকেজ নির্দেশ করে।
২. সনোগ্রাফি বা আল্ট্রাসাউন্ড (Sonohysterography)
* আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ফ্যালোপিয়ান টিউবে তরল জমা হয়েছে কি না, তা দেখা যায়।
৩. ল্যাপারোস্কোপি (Laparoscopy)
* এটি এক ধরনের ছোট অপারেশন, যেখানে একটি ক্যামেরাযুক্ত সরু নল দিয়ে পেটের ভেতরের অংশ পর্যবেক্ষণ করা হয়। এটি ব্লকের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে সাহায্য করে।
**ডিস্টাল টিউবাল ব্লকের চিকিৎসা
ডিস্টাল টিউবাল ব্লকের চিকিৎসা ব্লকের কারণ, গঠন এবং রোগীর সন্তান ধারণের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে।
১. সার্জারি (ল্যাপারোস্কোপিক বা মাইক্রোসার্জারি)-
* টিউবোপ্লাস্টি (Tuboplasty) – ব্লক সরিয়ে ফ্যালোপিয়ান টিউব পুনরায় খোলা হয়।
* ফিমব্রিওপ্লাস্টি (Fimbrioplasty) – ফ্যালোপিয়ান টিউবের ডিস্টাল অংশ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে এটিকে পুনরায় ঠিক করার চেষ্টা করা হয়।
২. অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি-
* যদি ব্লক সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে, তবে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।
ডিস্টাল টিউবাল ব্লকের প্রতিরোধের উপায়
* যৌনবাহিত সংক্রমণ প্রতিরোধ – সুরক্ষিত যৌনসম্পর্ক বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা।
* পেটের ইনফেকশন দ্রুত চিকিৎসা করা – যেকোনো ইনফেকশন হলে দ্রুত চিকিৎসা করানো দরকার।
* সঠিক ওজন বজায় রাখা – অতিরিক্ত ওজন এন্ডোমেট্রিওসিস এবং হরমোনজনিত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
* ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করা – এগুলো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং টিউবের কার্যক্ষমতা কমায়।
* গর্ভধারণের চেষ্টা করার আগে ডাক্তারি পরামর্শ নেওয়া – বিশেষ করে যদি কোনো জটিলতা থাকে।
উপসংহার
ডিস্টাল টিউবাল ব্লক মহিলাদের বন্ধ্যাত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এর দ্রুত নির্ণয় ও চিকিৎসা গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই গর্ভধারণ সম্ভব।

